অনেকেই ওজন কমানোর জন্য স্বাস্থ্যকর উপায় খোঁজেন, কিন্তু কিছু মানুষ আবার ওজন বাড়ানোর স্বাস্থ্যকর উপায় চায়। বিশেষ করে যারা খুব বেশি রোগা শরীর নিয়ে চিন্তাগ্রস্ত, তাদের জন্য স্বাস্থ্যকরভাবে মোটা হওয়া বর্তমান সময়ে অত্যন্ত জরুরি। তবে এজন্য শুধু বেশি খাওয়া নয়, প্রয়োজন সঠিক খাবার বেছে নেওয়ার মনোভাব, যাতে শরীর সুস্থ থাকে এবং স্বাস্থ্যকর ভাবে ধীরে ধীরে ওজন বাড়ে।
স্বাস্থ্য-সম্মত ভাবে কিভাবে ওজন বাড়ানো যায় তার খাবারের তালিকা নিচে তুলে ধরা হলো
কার্বোহাইড্রেট (শর্করা) সমৃদ্ধ খাবার গ্রহণ
ভাত (চাল), রুটি (গমের আটা দিয়ে তৈরি), আলু, মিষ্টি আলু, ভুট্টা, ডাল (যদিও এতে প্রোটিন থাকে তবে এর পাশাপাশি শর্করাও আছে), ফল (কলা, আম, আঙুর ইত্যাদি), চিনি ও মিষ্টি জাতীয় খাবার, পাস্তা ও নুডলস, বিস্কুট ও কেক ইত্যাদি কার্বোহাইড্রেট (শর্করা) সমৃদ্ধ খাবার। সহজভাবে বলতে গেলে শস্যজাতীয় খাবার, আলু জাতীয় খাবার এবং মিষ্টি জাতীয় খাবারগুলোতে কার্বোহাইড্রেট (শর্করা) বেশি থাকে।
এগুলো (কার্বোহাইড্রেট সমৃদ্ধ খাবার) শরীরে এনার্জি (শক্তি) যোগায় এবং অতিরিক্ত ক্যালোরি সরবরাহ করে। বেশি কার্বোহাইড্রেট (বিশেষ করে চিনি ও সাদা রুটি জাতীয় খাবার) রক্তে শর্করা দ্রুত বৃদ্ধি করতে সক্ষম। এর ফলে ইনসুলিন নিঃসরণ হয়, যা শরীরে ফ্যাট (চর্বি) জমাতে সাহায্য করে এবং এর পাশাপাশি ফ্যাট (চর্বি) পোড়ানো কমিয়ে দেয়। এভাবে নিয়মিত খাবারে কার্বোহাইড্রেট (শর্করা) রাখলে খুব সহজেই ওজন দ্রুত বাড়ানো সম্ভব।
প্রোটিন সমৃদ্ধ খাবার গ্রহণ
প্রোটিন বা আমিষ জাতীয় খাবার গুলো হলো ডিম (মুরগি, হাঁস, পোল্ট্রি), মাছ (ইলিশমাছ, রুইমাছ, স্যামনমাছ, টুনামাছ) , মুরগির মাংস, গরু ও খাসির মাংশ, দুধ, দই, পনির এছাড়াও উদ্ভিজ্জ উৎস থেকে প্রাপ্ত ডাল (মসুরডাল, মুগডাল, ছোলা, সয়াবিন), বাদাম (কাজুবাদাম, কাঠবাদাম, চিনাবাদাম, তিস্তাবাদাম), বীজ (তিল, সূর্যমুখীর বীজ, কুমড়ার বীজ), শিম জাতীয় খাবার (রাজমা, মটরশুটি) ইত্যাদি।
প্রোটিন (আমিষ) জাতীয় খাবার শরীরের পেশী গঠন করতে সহায়তা করে। এছাড়াও নিয়মিত ব্যায়ামের ফলে পেশী গঠনের ক্ষমতা বৃদ্ধি পায়। পেশী বাড়লে ওজনও বাড়ে, তবে সেটাকে স্বাস্থ্যকর ওজন বৃদ্ধি হিসেবে বিবেচনা করা হয়। প্রোটিন হরমোন উৎপাদনে, রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বৃদ্ধিতে সাহায্য করে। শুধু ফ্যাট (চর্বি) নয়, স্বাস্থ্যকর পেশী বাড়াতেও প্রোটিনের ভূমিকা অপরিহার্য। এছাড়াও আমাদের শরীর অতিরিক্ত প্রোটিনকে গ্লুকোজে রূপান্তর করতে পারে, যা এনার্জি (শক্তি) হিসেবে ব্যবহৃত হয় বা ফ্যাটে (চর্বিতে) জমা হয়। যা দিন শেষে আমাদের স্বাস্থ্যবৃদ্ধিতে সহায়তা করে।
স্বাস্থ্যকর ফ্যাট গ্রহণ
বাদাম (কাজুবাদাম, আখরোট, চিনাবাদাম, কাঠবাদাম, তিস্তাবাদাম) তিল, নারকেল থেকে প্রাপ্ত অলিভ অয়েল, ঘি, মাখন এগুলোতে ভালো পরিমাণে ফ্যাট (চর্বি) থাকে যা শরীরকে এনার্জি (শক্তি) দেয় এবং ওজন বৃদ্ধিতে সহায়তা করে। এছাড়াও মাছ (স্যামন, টুনা, ইলিশ), আখরোট, সূর্যমুখী বীজ, তিল, কুমড়ার বীজ ইত্যাদিতে ওমেগা-৩ ও ওমেগা-৬ ফ্যাটি অ্যাসিড থাকে যা ব্রেন (মস্তিষ্ক) ও হার্ট (হৃদপিণ্ডের) জন্য গুরত্বপূর্ণ।
স্বাস্থ্যকর ভাবে ফ্যাট (চর্বি) গ্রহণ করতে সক্ষম হলে আমাদের ত্বক ও চুলের স্বাস্থ্য ভালো থাকবে। কেননা এতে প্রতি গ্রামে প্রায় ৯ ক্যালোরি থাকে এবং সকল ধরনের ভিটামিন A, D, E, K শোষনে সাহায্য করে।
ক্যালোরি-সমৃদ্ধ খাবার গ্রহণ
মিল্কশেক ( প্রচুর চিনি ও ফ্যাট), আইসক্রিম, চিজ, পিজা, বার্গার (পরিমাণ নিয়ন্ত্রণে) মাঝে মাঝে এসব খাবার খেলে দ্রুত ক্যালোরি পাওয়া যায়। এগুলো শরীরকে দ্রুত মোটা করতে ত্বরান্বিত করে, তবে এটি সবসময় স্বাস্থ্যকরভাবে ওজন বৃদ্ধি করে না। তবে আমরা যদি স্বাস্থ্যকর ভাবে ক্যালোরি সমৃদ্ধ খাবার খেতে চায় তাহলে একমাত্র উপায় হলো সঠিকভাবে মিল্কশেক বানাতে হবে। যার জন্য ফুল-ক্রিম দুধ, ফল, বাদাম ব্যবহার করা যেতে পারে। আইসক্রিমের বদলে দই বা ফ্রোজেন ইয়োগার্ট খাওয়া যেতে পারে। পিজ্জায় সবজি, চিকেন, কম চিজ ব্যবহার করতে হবে।
সাধারণভাবে বলতে গেলে, এই খাবারগুলো উচ্চ পরিমাণে ক্যালোরি ও ফ্যাট (চর্বি) দিয়ে শরীরকে দ্রুত মোটা করে, কিন্তু স্বাস্থ্যকরভাবে মোটা হতে চাইলে এগুলো পরিমাণমত খাওয়া অত্যন্ত জরুরি।
টিপস
স্বাস্থ্যকরভাবে মোটা হওয়ার জন্য শুধু বেশি খাওয়াই যথেষ্ট নয়, বরং সুষম খাবার (খাদ্যের ছয়টি উপাদান যেখানে উপস্থিত থাকে), সঠিক অভ্যাস ও সঠিকভাবে জীবনযাপন করা অত্যন্ত জরুরি। এজন্য আমাদের অন্তত দিনে প্রায় ৫–৬ বার ছোট ছোট করে মিল খেতে হবে, যাতে করে নিয়মিত ক্যালোরি আমাদের শরীরে জমতে থাকে। হালকা ওজন তোলা (ভারউত্তোলন) (strength training) করা যেতে পারে। এতে আপনার খাবার শুধু ফ্যাট (চর্বি) না হয়ে পেশীতে জমা হতে শুরু করবে। এছাড়াও প্রতিদিন অন্তত ৮ ঘণ্টা ঘুমাতে হবে। মানসিক চাপ কমাতে হবে। কারণ স্ট্রেসে (মানসিক চাপ) ক্ষুধা কমে যেতে পারে এবং সেই সাথে পর্যাপ্ত পরিমাণে পানি পান করতে হবে।
সতর্কতা
খুব দ্রুত মোটা হওয়ার চেয়ে ধীরে ধীরে ওজন বাড়ানোই স্বাস্থ্যকর। পাশাপাশি আমাদের ডাক্তারের পরামর্শ ছাড়া যেকোন ধরনের সাপ্লিমেন্ট ব্যবহার থেকে বিরত থাকতে হবে। কেননা সাপ্লিমেন্ট আমাদের শরীরের স্থায়ী সমস্যা সৃষ্টি করতে পারে। এছাড়াও আমাদেরকে শরীরের প্রয়োজন অনুযায়ী খাবার খেতে হবে। অন্যথায় অতিরিক্ত খেলে অসুস্থ হওয়ার সম্ভাবনা অনেকাংশে বেড়ে যায়। যা আমাদের শরীরের দীর্ঘমেয়াদী অসুস্থতার কারণ হয়ে দাড়াতে পারে। তাই আমরা যদি উপরিউক্ত তালিকার খাবার গুলো সঠিকভাবে গ্রহণ করতে পারি তাহলে খুব সহজেই স্বাস্থ্যকর ভাবে মোটা হতে পারব।
BD Health Net এর নীতিমালা মেনে কমেন্ট করুন। প্রতিটি কমেন্ট রিভিউ করা হয়।
comment url